পাকিস্তানের আকাশসীমার জটিলতা কাটিয়ে দেশে পৌঁছাল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউরেনিয়াম
ঢাকা, ৩ অক্টোবর ২০২৬: পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতা কাটিয়ে অবশেষে রাশিয়া থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউরেনিয়াম জ্বালানির চালান বাংলাদেশে পৌঁছেছে। শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাত পৌনে ১২টার দিকে ইউরেনিয়াম বহনকারী বিশেষ কার্গো উড়োজাহাজটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়রা) চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান।
এর আগে চালানটি ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে আসার নির্ধারিত রুটে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে উড়োজাহাজটি যাত্রা করতে পারেনি। ফলে প্রায় এক সপ্তাহ পিছিয়ে যায় ইউরেনিয়াম পরিবহন।
আকাশসীমার অনুমতি নিয়ে জটিলতা
রূপপুর প্রকল্পের পরিচালক কবির হোসেন জানান, ইউরেনিয়াম পরিবহনের জন্য বিভিন্ন দেশের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি প্রয়োজন হয়। প্রচলিত রুটে কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতের আকাশসীমা ব্যবহারের বিষয়টি রয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে রসাটমের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে প্রয়োজনীয় সব দেশের অনুমোদন পাওয়া যায়নি। পরদিনও কূটনৈতিকভাবে অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা চলছিল। শেষ পর্যন্ত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে জানানো হয়, নির্ধারিত রুটের অনুমোদন না পাওয়ায় ফ্লাইটটি স্থগিত করা হয়েছে।
তবে পরে নতুন সূচি অনুযায়ী পরিবহন কার্যক্রম শুরু হয় এবং শুক্রবার রাতে বিশেষ কার্গো উড়োজাহাজে চালানটি ঢাকায় পৌঁছে যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরেনিয়াম বহনকারী উড়োজাহাজটি রাশিয়ায় তৈরি চার ইঞ্জিনের ইলিউশিন আইএল-৭৬ মডেলের।
কেন এই ইউরেনিয়াম গুরুত্বপূর্ণ?
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানির একটি অংশ নির্দিষ্ট সময় পর প্রতিস্থাপন করতে হয়। প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন, প্রথম ইউনিটের জ্বালানি ইতোমধ্যে চুল্লিতে লোড করা হয়েছে এবং প্রায় এক বছর পর জ্বালানি পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে।
প্রথম ইউনিটের পরবর্তী জ্বালানি সরবরাহের জন্য দুটি ফ্লাইটের পরিকল্পনা ছিল। একটি ফ্লাইট ২৪ সেপ্টেম্বর এবং আরেকটি ১ অক্টোবর আসার কথা ছিল। আকাশসীমা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রথম নির্ধারিত ফ্লাইটটি পিছিয়ে যায়।
দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি আসবে কয়েক ধাপে
রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্যও পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের প্রস্তুতি চলছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি প্রতিষ্ঠান রসাটম জানিয়েছে, দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। কয়েকটি ফ্লাইটে ধাপে ধাপে এই জ্বালানি বাংলাদেশে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালকের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিটের প্রথম জ্বালানি সরবরাহের জন্য সাতটি ফ্লাইটের পরিকল্পনা রয়েছে। ৮ অক্টোবর থেকে প্রতি সপ্তাহে একটি করে ফ্লাইটে জ্বালানি আনার কথা রয়েছে।
রূপপুর প্রকল্পে নিরাপত্তা সর্বোচ্চ গুরুত্বে
রূপপুর বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত এই প্রকল্পে দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর ইউনিট রয়েছে। দুই ইউনিটের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা বিধি অনুসরণ করা হয়। এর আগেও রূপপুরের ইউরেনিয়াম বাংলাদেশে আসার সময় বিমানবন্দর থেকে প্রকল্প এলাকায় নেওয়ার পথে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালে প্রথম ইউনিটের ইউরেনিয়ামের কয়েকটি চালান বিশেষ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে রূপপুরে পৌঁছেছিল।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে আরেক ধাপ
রূপপুরের প্রথম ইউনিটে ইতোমধ্যে পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে পারমাণবিক জ্বালানি লোড করার কার্যক্রম শুরু হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
নতুন ইউরেনিয়াম চালান দেশে পৌঁছানোর ফলে প্রথম ইউনিটের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলো। একই সঙ্গে দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহও অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে সাময়িক জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময় পিছিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত ইউরেনিয়ামের চালান বাংলাদেশে পৌঁছেছে। এখন পরবর্তী ধাপে জ্বালানি নিরাপদভাবে সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রকল্পের নির্ধারিত কার্যক্রমে ব্যবহারের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হবে।